সাইবার সিকিউরিটি কি ? ইন্টারনেটের সিকিউরিটির গুরুত্ব।

ইন্টারনেটের ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে, তার সাথে বাড়ছে ইন্টারনেটের সিকিউরিটির গুরুত্ব। ইন্টারনেট ব্যবহার করে যেমন অনেকে ভাল করা সম্ভব তেমনি ক্ষতিও করা সম্ভব। হ্যাকিং করাটা বোধ হয় আজকাল বেশ সহজ হয়ে গেছে। আজকাল সবার অনলাইন অ্যাকাউন্টই কম বেশি হ্যাকিং এর ঝুকিতে থাকে। তাই সবার সাইবার সিকিউরিটি সম্পর্কে জানতে হবে। আপনি যদি সাবধান না থাকেন আপনিও ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারেন।

সাইবার সিকিউরিটি কি?

ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত সকল ডিভাইস বা প্রযুক্তিকে সাইবার বলা হয়। অর্থাৎ কম্পিউটার, সার্ভার, মোবাইল ইত্যাদি। বিভিন্ন কাজে আমরা ইন্টারনেট ব্যবহার করি, যেখানে অনেক ইনফরমেশন ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকে। যার কারনে নিরাপত্তা দরকার, যাতে কেউ আপনার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতিয়ে নিতে না পারে।

এই তথ্য প্রযুক্তির যুগে আপনি কিভাবে সাইবার হামলা বা হ্যাকিং এর শিকার হতে পারেন তা নিয়ে আলোচনা করবো।

আপনার স্মার্টফোনেও হতে পারে সাইবার হামলাঃ

আপনি ভাবতেই পারেন, যারা কম্পিউটার ব্যবহার করেন, তারাই শুধুমাত্র হ্যাকিং এর শিকার হবেন। যদি এমনটি ভেবে থাকেন তাহলে আপনি ভূল ভাবছেন। শুধু যে কম্পিউটার/ল্যাপটপ ব্যবহার করলেই হ্যাকিং এর শিকার হবেন এমনটা নয়। সাইবার সিকিউরিটি সম্পর্কে না জানলে আপনার হাতে থাকে স্মার্ট ফোনটিও আপনার জন্য কাল হতে পারে। একজন অনবিজ্ঞ লোকের কাছে গ্রেনেড থাকা আর সাইবার সিকিউরিটি সম্পর্কে অজ্ঞ লোকের কাছে একটি স্মার্ট ফোন থাকা একই কথা।

ফিশিং:

মনে করুন আপনার মেসেঞ্জারে একজন একটি লিংক দিয়ে বললো যে এখানে আপনার কিছু খারাপ ছবি আছে। আপনি তখন কোন কিছু না চিন্তা করে ঐ লিঙ্কে ক্লিক করবেন। ক্লিক করে দেখলেন যে ফেসবুকের লগ ইন ফর্ম। আপনি হয়তো ভাবলেন কোন কারনে হয়তো লগ আউট হয়ে গেছে, আপনি পুনরায় লগ ইন করলেন এবং আপনাকে আবার ফেসবুকের কোন একটি পোস্ট বা কিছু একটি দেখলেন।

আসলে এখানে আপনার ফেসবুকটি লগ আউট হয়নি। ঐ লিঙ্কটিতে প্রবেশ করে আপনি হ্যাকারের তৈরী করা ফেসবুকের লগ ইন পেজ দেখতে পেয়েছেন। সেখানে সে ইমেইল/মোবাইল নং এবং পাসওয়ার্ড দিয়েছেন সেটি হ্যাকারের কাছে চলে গিয়েছে।

এটি হচ্ছে ফিসিং। কিছু সাইবার ক্রাইম আছে যারা লিঙ্ক এর মাধ্যমে তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। এটি একটি মারাত্মক হ্যাকিং পদ্ধতি।

এছাড়াও ফিসিং অ্যাটাক গুলো অনেক সময় ক্রেডিট কার্ডের তথ্য চুরির জন্য ব্যবহার করা হয়। শুধু যে ফেসবুক, ক্রডিট কার্ডে এমনটা হবে তা নয়, বিভিন্ন ভাবে হতে পারে। আপনাকে সতর্ক হতে হবে। অচেনা কোন লিংকে না জেনে ক্লিক করা যাবে না।

ফেসবুকে সাইবার হামলাঃ

মনে করুন আপনি ইন্টারনেটে তেমন কোন কাজ করেন না । শুধু ফেসবুক ব্যবহার করেন। তাই নিজেকে নিরাপদ ভাবতেই পারেন। কিন্তু আপনার এই ধারনা ভুল। ফেসবুকের মাধ্যমেই আপনি সাইবার হামলার শিকার হতে পারেন। কিভাবে?

আপনার ছবি বা তথ্য দিয়ে একটি ফেসবুক একাউন্ট খুলে আপনার পরিচয়ে অন্যদের সাথে ক্রাইম করতে পারে। ফলে আপনি সকলের কাছে খারাপ মন্তব্যের শিকার হবেন। এখন বলতেই পারেন এখানে তো আপনার কোন হাত নেই বা সাইবার নিরাপত্তার তেমন কোন বিষয় নেই। তবুও নিজের ব্যাক্তিগত নিরাপত্তার জন্য এই দিকটিও খেয়াল রাখতে হবে।

আবার আপনার ফেসবুক একাউন্টটি হ্যাকিং এর মাধ্যমে সাইবার ক্রাইমের শিকার হতে পারেন। আমাদের দেশের মেয়েরা ফেসবুক হ্যাকিং এর শিকার বেশি হয়ে থাকে।

ব্যাকডোর:

আমরা অনেক সময় ফ্রি সফটওয়্যার বা বিভিন্ন ক্রাকিং টুলস ব্যবহার করে থাকি। এসব সফটওয়্যার বা টুলস এ থাকতে পারে কোন ম্যালওয়ার বা হ্যাকিং স্ক্রিপ্ট। ঘরের পিছনের দরজা যেমন ব্যাকডোর তেমনি আপনার ওয়েবসাইট বা সিস্টেমের কথাও যদি এরকম গোপন কোন দরজা থাকে তাহলে সেটাই ব্যাকডোর। বিভিন্ন ফ্রী সফটওয়্যারে এরকম ব্যাকডোর অনেক সময় দেখা যায়। তাই ফ্রী জিনিস ব্যবহারে সাবধান হোন। এবং এই ধরনের ব্যাকডোর ব্যবহার করেই হ্যাকার আপনার কম্পিউটারের অনেক বড় ক্ষতি করে ফেলতে পারে।

ম্যালওয়ার অ্যাটাকঃ

এটি একটি সফটওয়্যার, যা হ্যাকারদের নির্দিষ্ট কাজ হাসিলের জন্য তারা ব্যবহার করে থাকে। এটি সাধারণত ডেট চুরি বা তথ্য হাতিয়ে নিতে ব্যবহার করা হয়। অনেক সময় অবৈধ ইমেইল বা অপরিচিত সোর্স থেকে ফাইল ডাউনলোডের মাধ্যমে ছড়িয়ে পরে ম্যালওয়ার। হ্যাকার রা বিভিন্ন ডেটা চুরি করে বা নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে ফাঁস করার হুমকি দিয়ে দাবি করে মুক্তি পণ।

এছাড়াও আরো অনেক ভাবে আমরা সাইবার হামলা বা হ্যাকিং এর শিকার হতে পারি। এসব থেকে বাচতে আমাদের সতর্ক হতে হবে। সাইবার সিকিউরিটি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে হবে। হ্যাকিং বা সাইবার হামলা থেকে আমরা যা করতে পারি

দুই স্তরের নিরাপত্তা ব্যবহার:

এখন শুধু পাসওয়ার্ড দিয়েই নিজেকে নিরাপদ ভাবা ঠিক হবে না। নিজের একাউন্ট আরো নিরাপদ রাখতে টু-স্টেপ অথেনটিকেশন বা দুই স্তরের নিরাপত্তা ব্যবহার করুন। এখন অনেক ওয়েবসাইট বা সার্ভিস দুই স্তরের নিরাপত্তা দিচ্ছে। দুই স্তরের এই ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়ায় ব্যবহারকারীকে তাঁর অ্যাকাউন্টে নিয়মিত পাসওয়ার্ড ব্যবহারের পাশাপাশি লগ ইন করার সময় স্মার্টফোন ও ট্যাবে আরও একটি কোড ব্যবহার করতে হয়। এতে অতিরিক্ত একটি স্তরের নিরাপত্তা পাওয়া যায়। তাই যতক্ষণ হাতে মোবাইল ফোন থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত আর কেউ অ্যাকাউন্টে ঢুকতে পারছে না সেই বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়।

পাবলিক ওয়াইফাই ব্যবহার থেকে বিরত থাকুনঃ

আমরা শপিং মল বা কোন রেস্টুরেন্টে গিয়ে পাবলিক ওয়াইফাই ব্যবহার করে থাকি। এতে ঐ নেটওয়ার্কে হ্যাকার যুক্ত হয়ে আমার ডিভাইসের এক্সেস নিয়ে নিতে পারে। পাবলিক ওয়াইফাই ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন।

ফোনের ওয়াই-ফাই বন্ধ রাখুনঃ

সব সময় ফোনের ওয়াই-ফাই বা ব্লুটুথ চালু রাখবেন না। হ্যাকারদের ঝোঁকই হচ্ছে এ ধরনের সুযোগ খোঁজা। সব সময় ওয়াই-ফাই বা ব্লুটুথ চালু রাখলে অপরিচিত ব্যক্তিরাও ফোনের মধ্যে কী আছে, তা দেখার জন্য চেষ্টা চালায়।

সব সময় চালু রাখলে কী সমস্যা? সমস্যা হচ্ছে, আগে কোন কোন নেটওয়ার্কে আপনি সক্রিয় ছিলেন হ্যাকাররা তা জানতে পারেন। আগের সেই নেটওয়ার্কের সূত্র ধরে হ্যাকাররা প্রতারণার ফাঁদ পাতেন। হ্যাকাররা আগের নেটওয়ার্কের ছদ্মবেশে নতুন নেটওয়ার্ক তৈরি করে আপনার ফোনকে আগের কোনো ওয়াই-ফাই বা ব্লুটুথ নেটওয়ার্কে যুক্ত করার জন্য প্রলোভন দেখায়। একবার এই নেটওয়ার্কে ঢুকে পড়লে হ্যাকাররা ফোনে অসংখ্য ম্যালওয়্যার ঢুকিয়ে দেন এবং আপনার অজান্তেই ফোন থেকে তথ্য চুরি, নজরদারির মতো কাজগুলো চালিয়ে যান। তাই যখন প্রয়োজন থাকে না, তখনই ওয়াই-ফাই ও ব্লুটুথ বন্ধ রাখুন।

মনে রাখবেন হ্যাকিং বা সাইবার হামলা ইন্টারনেটের মাধ্যমেই সংঘটিত হয়। আপনি যদি ইন্টারনেটে যুক্ত না থাকেন তাহলে হ্যাকিং এর সুযোগ থাকবে না। তাই অপ্রয়োজনে ফোনের ওয়াইফাই বন্ধ রাখুন।

স্ট্রং পাসওয়ার্ডের ব্যবহারঃ

যেসব অ্যাকাউন্ট বা ওয়েবসাইটে আপনার স্পর্শকাতর তথ্য রয়েছে, সেগুলোতে দীর্ঘ ও জটিল পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন। অক্ষর, চিহ্ন, সংখ্যা প্রভৃতি মিলিয়ে পাসওয়ার্ড জটিল করে তুলুন। প্রতিটি ওয়েবসাইটের জন্য আলাদা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন এবং নির্দিষ্ট সময় পর পর পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করুন।

সফটওয়্যার আপডেট রাখুনঃ

আপনার সফটওয়্যার এবং অপারেটিং সিস্টেম নিয়মিত আপডেট রাখুন। নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে আপনার কম্পিউটার বা মোবাইল ফোনের সফটওয়্যার এবং অপারেটিং সিস্টেম আপডেট রাখুন।

লিঙ্কে প্রবেশের আগে চেক করে নিনঃ

কারো দেওয়া লিংকে প্রবেশে আগে তা ভালোভাবে চেক করে নিন। প্রয়োজনে virustotoal.com এ গিয়ে লিঙ্কটি চেক করে নিন। এছাড়াও প্রতিটি ওয়েবসাইট ব্রাউজের সময় এইচটিটিপিএস ব্যবহার করুন। এইচটিটিপিএস ব্যবহার করতে ‘এইচটিটিপিএস এভরিহোয়্যার’ টুলটি ব্যবহার করতে পারেন। এই টুলটি আপনার ব্রাউজারের সব তথ্য এনক্রিপ্ট করে। আপনি যদি অ্যাড্রেস বারে শুধু এইচটিটিপি ব্যবহার করেন, তবে যে কেউ আপনার ইন্টারনেট ব্রাউজের বিষয়ে নজরদারি করতে পারে।

পাবলিক প্লেসে ফোন চার্জ করা থেকে বিরত থাকুনঃ

পাবলিক প্লেসে কখন ফোন চার্জ করবেন না। কারন সেখানে থাকতে পারে হ্যাকারের ফাদ। সেখান থেকে আপনার ফোনটি চার্জ করলে বা সংযুক্ত করলে আপনার ডিভাইসে সকল তথ্য হ্যাক হতে পারে অথবা ইউএসবি ক্যাবলের মাধ্যমে ডেটা চুরি হতে পারে।

ইন্টারনেট ব্যবহার করলেই হবে না। ইন্টারনেটের ক্ষতিকর দিকগুলো আমাদের জানা ও সতর্ক থাকাটাও জরুরী।